০৩:৪৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৮ জানুয়ারী ২০২৬, ২৪ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

হিমছোঁয়া পান্ডুলিপি” শালবনের বুকে শব্দের উৎসব

মারুফ হোসেন :

সময়ের একটি নিজস্ব স্বভাব আছে সে অনেক কিছু মুছে দেয়, আবার কিছু কিছু মুহূর্তকে যত্ন করে রেখে দেয় ইতিহাসের পাতায়। সাহিত্য সেই মুহূর্তগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম। যখন যান্ত্রিকতা মানুষের অনুভূতিকে অবশ করে দেয়, তখন সাহিত্যের একটিমাত্র শব্দও হয়ে উঠতে পারে উষ্ণ আশ্রয়।
মুক্তাগাছা সাহিত্য সংসদের উদ্যোগে আয়োজিত সাহিত্য আড্ডা ‘হিমছোঁয়া পান্ডুলিপি’ তেমনই একটি মুহূর্ত যা কেবল একটি দিনের আয়োজন নয়, বরং একটি সময়ের সাক্ষ্য। মধুপুর শালবনের ভেতরে, প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্যে বসে কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী ও চিন্তকেরা যেসব কথা বলেছেন, যেসব শব্দ উচ্চারণ করেছেন সেগুলো হারিয়ে যাওয়ার নয়।
এই স্মরণিকা সেই স্মৃতিগুলোকে ধরে রাখার একটি প্রয়াস। এখানে রয়েছে আয়োজনের কথা, আলোচনার রেশ, কবিতার অনুরণন আর মানুষের মুখে মুখে ঘুরে বেড়ানো ভাবনার প্রতিচ্ছবি। আমরা বিশ্বাস করি, এই গ্রন্থ ভবিষ্যতে ফিরে দেখার মতো একটি দলিল হয়ে থাকবে।
একটি আড্ডা, একটি সময়, একটি পান্ডুলিপি,
সব লেখা পূর্ণ হয় না। কিছু লেখা চলমান থাকেখসড়ার মতো, পান্ডুলিপির মতো। ‘হিমছোঁয়া পান্ডুলিপি’ তেমনই এক চলমান লেখার নাম। হিমে ছোঁয়া এক সময়ের ভেতর দাঁড়িয়ে, শব্দ দিয়ে উষ্ণতা তৈরি করার একটি সাহসী প্রয়াস।
মুক্তাগাছা ময়মনসিংহের এই জনপদ বহুদিন ধরেই সাহিত্য ও সংস্কৃতির ধারক। সেই ধারাবাহিকতায় মুক্তাগাছা সাহিত্য সংসদ আয়োজন করে এই ব্যতিক্রমী সাহিত্য আড্ডা, যেখানে প্রকৃতি ছিল মঞ্চ, আর মানুষ ছিল শ্রোতা ও শিল্পী একই সঙ্গে।
অধ্যায় এক
শালবন: যেখানে প্রকৃতি প্রথম কবিতা
মধ্য পৌষের সকাল।
কুয়াশা তখনো পাতার গায়ে জমে আছে।
শালবনের ভেতর আলো ঢুকছে ধীরে ধীরে যেন সময় নিজেই থমকে গেছে।
দূরে অতিথি পাখির দল উড়ে যায়, জলধারার শব্দ কানে আসে, মাঝেমধ্যে শেয়ালের ডাক প্রকৃতিকে করে তোলে আরও রহস্যময়। এই পরিবেশেই শুরু হয় ‘হিমছোঁয়া পান্ডুলিপি’প্রকৃতির কোলে মানুষের সৃজনশীলতার এক মিলনমেলা।
অধ্যায় দুই
আয়োজনের দর্শন ও কাঠামো
এই আয়োজনের মূল দর্শন ছিল আনুষ্ঠানিকতার বাইরে সাহিত্য।
কোনো জাঁকজমক নয়, নেই কঠোর শিডিউল।
আছে কেবল আড্ডা যেখানে কথা নিজেই পথ খুঁজে নেয়।
সভাপতিত্ব করেন মুক্তাগাছা সাহিত্য সংসদের সভাপতি কবি সুরঞ্জিত বাড়ই। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে সাহিত্যের দায়বদ্ধতা ও প্রান্তিক অঞ্চলে সাহিত্যচর্চার গুরুত্ব।
সাধারণ সম্পাদক কবি সৌহার্য্য ওসমান-এর সঞ্চালনায় পুরো আয়োজনটি হয়ে ওঠে স্বতঃস্ফূর্ত ও অন্তরঙ্গ।
উদ্বোধন ও প্রধান অতিথির বক্তব্য
অনুষ্ঠানের উদ্বোধক মুক্তাগাছা উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মতিউর রহমান খোকন বলেন, সাহিত্য মানুষের ভেতরের নৈতিক শক্তিকে জাগ্রত করে।
প্রধান অতিথি তারুণ্যের বাংলাদেশ-এর চেয়ারম্যান আলামিন সুজন বলেন
“রাজনীতি সমাজের কাঠামো বদলায়, কিন্তু সাহিত্য বদলায় মানুষের মন।”
এই কথাগুলো শালবনের নীরবতায় গভীর প্রতিধ্বনি তোলে।
আলোচনায় সময়, মানুষ ও সাহিত্য
প্রধান আলোচক কবি কাজী নাসির মামুন সময় ও কবিতার সম্পর্ক নিয়ে গভীর আলোচনা করেন। তাঁর মতে
“এই সময় হিমে ঢাকা, কিন্তু কবিতার ভেতরে আগুন এখনো নিভে যায়নি।”
বিশেষ আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন
কবি মাহবুবুল আলম রতন,
বাচিক শিল্পী ও নাট্যকার মিহির হারুন,
কবি দীপংকর মারডুক,
প্রাবন্ধিক এম ইদ্রিছ আলী,
শিক্ষাবিদ হাবিবুর রহমান হিরা,
কবি ও সাংবাদিক ফেরদৌস তাজ।
আলোচনায় উঠে আসে
সমকালীন সাহিত্যের সংকট
লোকজ সংস্কৃতির গুরুত্ব
নতুন প্রজন্মের লেখকদের ভূমিকা
সাহিত্যের সামাজিক দায়
কবিতা পাঠ: শব্দের ব্যক্তিগত দলিল
এই আড্ডার হৃদয় ছিল কবিতা পাঠ।
একজনের পর একজন কবি উঠে দাঁড়ান, পাঠ করেন তাঁদের লেখা।
কবি সফিক সিদ্দিকী, আল আমিন মন্ডল, রোকন শাহরিয়ার সোহাগ, সেলিম সাইফুল, শাহিদ লোটাস, হাসান মাসুদ, মুজিব রাহমান, আব্দুস সালাম, রিপন সারওয়ার, তাজুল ইসলাম, রাশিদুল আলম শিমুল, মীর সবুর, তারিকুল ইসলাম ছোটনসহ আরও অনেকেই অংশ নেন।
এই কবিতাগুলো ছিল সময়ের আত্মকথা।
গান, অভিনয় ও লোকজ স্মৃতি
ফোকলোর গবেষক মাসুদ পারভেজ লোকজ সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা নিয়ে আলোচনা করেন।
বাচিক শিল্পী ও নাট্যকার মিহির হারুন-এর একক অভিনয় দর্শকদের মনে গভীর রেখাপাত করে। গান ও অভিনয়ে শালবনের নীরবতা যেন নতুন ভাষা পায়।
বিকেলের আলো, মানুষের মুখ
দিন গড়িয়ে বিকেল নামে। আলো ফিকে হয়, কুয়াশা ফিরে আসে। কিন্তু মানুষের চোখে তখনো আলো।
আড্ডা ভাঙে না কেবল রূপ বদলায়। ছোট ছোট দলে বসে কথা চলে কবিতা, ভবিষ্যৎ আয়োজন, জীবনের মানে নিয়ে।
মহাকালের দিকে ছুড়ে দেওয়া শব্দ
‘হিমছোঁয়া পান্ডুলিপি’ একটি দিন নয় এটি একটি দলিল।
একটি সময়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে শব্দ দিয়ে উষ্ণতা তৈরির প্রয়াস।
মহাকাল অনেক কিছু মুছে দেবে,
কিন্তু এই শালবনে উচ্চারিত শব্দগুলো
মানুষের ভেতরে বেঁচে থাকবে।
কারণ, সময় যত হিমশীতলই হোক,
মানুষ ততদিন মানুষ থাকবে,
যতদিন সে সাহিত্যকে সঙ্গে রাখবে।

জনপ্রিয় খবর

দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আত্মার মাগফেরাত কামনায় ময়মনসিংহ মহানগর ৬ নং ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক দলের দোয়া মাহফিল

হিমছোঁয়া পান্ডুলিপি” শালবনের বুকে শব্দের উৎসব

সর্বশেষ আপডেট : ০৬:৪৭:২৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৫ জানুয়ারী ২০২৬

মারুফ হোসেন :

সময়ের একটি নিজস্ব স্বভাব আছে সে অনেক কিছু মুছে দেয়, আবার কিছু কিছু মুহূর্তকে যত্ন করে রেখে দেয় ইতিহাসের পাতায়। সাহিত্য সেই মুহূর্তগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম। যখন যান্ত্রিকতা মানুষের অনুভূতিকে অবশ করে দেয়, তখন সাহিত্যের একটিমাত্র শব্দও হয়ে উঠতে পারে উষ্ণ আশ্রয়।
মুক্তাগাছা সাহিত্য সংসদের উদ্যোগে আয়োজিত সাহিত্য আড্ডা ‘হিমছোঁয়া পান্ডুলিপি’ তেমনই একটি মুহূর্ত যা কেবল একটি দিনের আয়োজন নয়, বরং একটি সময়ের সাক্ষ্য। মধুপুর শালবনের ভেতরে, প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্যে বসে কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী ও চিন্তকেরা যেসব কথা বলেছেন, যেসব শব্দ উচ্চারণ করেছেন সেগুলো হারিয়ে যাওয়ার নয়।
এই স্মরণিকা সেই স্মৃতিগুলোকে ধরে রাখার একটি প্রয়াস। এখানে রয়েছে আয়োজনের কথা, আলোচনার রেশ, কবিতার অনুরণন আর মানুষের মুখে মুখে ঘুরে বেড়ানো ভাবনার প্রতিচ্ছবি। আমরা বিশ্বাস করি, এই গ্রন্থ ভবিষ্যতে ফিরে দেখার মতো একটি দলিল হয়ে থাকবে।
একটি আড্ডা, একটি সময়, একটি পান্ডুলিপি,
সব লেখা পূর্ণ হয় না। কিছু লেখা চলমান থাকেখসড়ার মতো, পান্ডুলিপির মতো। ‘হিমছোঁয়া পান্ডুলিপি’ তেমনই এক চলমান লেখার নাম। হিমে ছোঁয়া এক সময়ের ভেতর দাঁড়িয়ে, শব্দ দিয়ে উষ্ণতা তৈরি করার একটি সাহসী প্রয়াস।
মুক্তাগাছা ময়মনসিংহের এই জনপদ বহুদিন ধরেই সাহিত্য ও সংস্কৃতির ধারক। সেই ধারাবাহিকতায় মুক্তাগাছা সাহিত্য সংসদ আয়োজন করে এই ব্যতিক্রমী সাহিত্য আড্ডা, যেখানে প্রকৃতি ছিল মঞ্চ, আর মানুষ ছিল শ্রোতা ও শিল্পী একই সঙ্গে।
অধ্যায় এক
শালবন: যেখানে প্রকৃতি প্রথম কবিতা
মধ্য পৌষের সকাল।
কুয়াশা তখনো পাতার গায়ে জমে আছে।
শালবনের ভেতর আলো ঢুকছে ধীরে ধীরে যেন সময় নিজেই থমকে গেছে।
দূরে অতিথি পাখির দল উড়ে যায়, জলধারার শব্দ কানে আসে, মাঝেমধ্যে শেয়ালের ডাক প্রকৃতিকে করে তোলে আরও রহস্যময়। এই পরিবেশেই শুরু হয় ‘হিমছোঁয়া পান্ডুলিপি’প্রকৃতির কোলে মানুষের সৃজনশীলতার এক মিলনমেলা।
অধ্যায় দুই
আয়োজনের দর্শন ও কাঠামো
এই আয়োজনের মূল দর্শন ছিল আনুষ্ঠানিকতার বাইরে সাহিত্য।
কোনো জাঁকজমক নয়, নেই কঠোর শিডিউল।
আছে কেবল আড্ডা যেখানে কথা নিজেই পথ খুঁজে নেয়।
সভাপতিত্ব করেন মুক্তাগাছা সাহিত্য সংসদের সভাপতি কবি সুরঞ্জিত বাড়ই। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে সাহিত্যের দায়বদ্ধতা ও প্রান্তিক অঞ্চলে সাহিত্যচর্চার গুরুত্ব।
সাধারণ সম্পাদক কবি সৌহার্য্য ওসমান-এর সঞ্চালনায় পুরো আয়োজনটি হয়ে ওঠে স্বতঃস্ফূর্ত ও অন্তরঙ্গ।
উদ্বোধন ও প্রধান অতিথির বক্তব্য
অনুষ্ঠানের উদ্বোধক মুক্তাগাছা উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মতিউর রহমান খোকন বলেন, সাহিত্য মানুষের ভেতরের নৈতিক শক্তিকে জাগ্রত করে।
প্রধান অতিথি তারুণ্যের বাংলাদেশ-এর চেয়ারম্যান আলামিন সুজন বলেন
“রাজনীতি সমাজের কাঠামো বদলায়, কিন্তু সাহিত্য বদলায় মানুষের মন।”
এই কথাগুলো শালবনের নীরবতায় গভীর প্রতিধ্বনি তোলে।
আলোচনায় সময়, মানুষ ও সাহিত্য
প্রধান আলোচক কবি কাজী নাসির মামুন সময় ও কবিতার সম্পর্ক নিয়ে গভীর আলোচনা করেন। তাঁর মতে
“এই সময় হিমে ঢাকা, কিন্তু কবিতার ভেতরে আগুন এখনো নিভে যায়নি।”
বিশেষ আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন
কবি মাহবুবুল আলম রতন,
বাচিক শিল্পী ও নাট্যকার মিহির হারুন,
কবি দীপংকর মারডুক,
প্রাবন্ধিক এম ইদ্রিছ আলী,
শিক্ষাবিদ হাবিবুর রহমান হিরা,
কবি ও সাংবাদিক ফেরদৌস তাজ।
আলোচনায় উঠে আসে
সমকালীন সাহিত্যের সংকট
লোকজ সংস্কৃতির গুরুত্ব
নতুন প্রজন্মের লেখকদের ভূমিকা
সাহিত্যের সামাজিক দায়
কবিতা পাঠ: শব্দের ব্যক্তিগত দলিল
এই আড্ডার হৃদয় ছিল কবিতা পাঠ।
একজনের পর একজন কবি উঠে দাঁড়ান, পাঠ করেন তাঁদের লেখা।
কবি সফিক সিদ্দিকী, আল আমিন মন্ডল, রোকন শাহরিয়ার সোহাগ, সেলিম সাইফুল, শাহিদ লোটাস, হাসান মাসুদ, মুজিব রাহমান, আব্দুস সালাম, রিপন সারওয়ার, তাজুল ইসলাম, রাশিদুল আলম শিমুল, মীর সবুর, তারিকুল ইসলাম ছোটনসহ আরও অনেকেই অংশ নেন।
এই কবিতাগুলো ছিল সময়ের আত্মকথা।
গান, অভিনয় ও লোকজ স্মৃতি
ফোকলোর গবেষক মাসুদ পারভেজ লোকজ সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা নিয়ে আলোচনা করেন।
বাচিক শিল্পী ও নাট্যকার মিহির হারুন-এর একক অভিনয় দর্শকদের মনে গভীর রেখাপাত করে। গান ও অভিনয়ে শালবনের নীরবতা যেন নতুন ভাষা পায়।
বিকেলের আলো, মানুষের মুখ
দিন গড়িয়ে বিকেল নামে। আলো ফিকে হয়, কুয়াশা ফিরে আসে। কিন্তু মানুষের চোখে তখনো আলো।
আড্ডা ভাঙে না কেবল রূপ বদলায়। ছোট ছোট দলে বসে কথা চলে কবিতা, ভবিষ্যৎ আয়োজন, জীবনের মানে নিয়ে।
মহাকালের দিকে ছুড়ে দেওয়া শব্দ
‘হিমছোঁয়া পান্ডুলিপি’ একটি দিন নয় এটি একটি দলিল।
একটি সময়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে শব্দ দিয়ে উষ্ণতা তৈরির প্রয়াস।
মহাকাল অনেক কিছু মুছে দেবে,
কিন্তু এই শালবনে উচ্চারিত শব্দগুলো
মানুষের ভেতরে বেঁচে থাকবে।
কারণ, সময় যত হিমশীতলই হোক,
মানুষ ততদিন মানুষ থাকবে,
যতদিন সে সাহিত্যকে সঙ্গে রাখবে।