মারুফ হোসেন :
শহরের কেন্দ্রস্থল হিসেবে পরিচিত সদর কোতোয়ালি মডেল থানা বর্তমানে চরম জনবল সংকটে ভুগছে। বিপুল জনগোষ্ঠী, বিস্তৃত এলাকা, সিটি কর্পোরেশনের গুরুত্বপূর্ণ ওয়ার্ড এবং প্রতিদিন বাড়তে থাকা অভিযোগ, জিডি ও মামলার চাপ সামলাতে গিয়ে কার্যত হিমসিম খাচ্ছে থানা পুলিশ। এই বাস্তবতায় সাধারণ মানুষ কাঙ্ক্ষিত পুলিশি সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ময়মনসিংহ সদর উপজেলা ও সিটি কর্পোরেশন মিলিয়ে সদর কোতোয়ালি মডেল থানা যে এলাকার দায়িত্বে রয়েছে, তার আয়তন প্রায় ৩৭৬ বর্গকিলোমিটার। এই বিশাল এলাকায় বসবাস করছে চার লক্ষাধিক মানুষ। সদর উপজেলায় রয়েছে ১১টি ইউনিয়ন, আর ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশনের অন্তর্ভুক্ত রয়েছে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ওয়ার্ড, যেখানে প্রশাসনিক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসা-বাণিজ্য ও পরিবহন কেন্দ্রিক কার্যক্রম দিনরাত চলমান।
বিভাগীয় শহর হওয়ায় প্রতিদিনই সদর কোতোয়ালি থানায় ভিড় করেন অসংখ্য মানুষ। পারিবারিক বিরোধ, জমি সংক্রান্ত ঝামেলা, নারী ও শিশু নির্যাতন, মাদক, চুরি, ছিনতাই, সড়ক দুর্ঘটনা থেকে শুরু করে গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ পর্যন্ত সব ধরনের অভিযোগ জমা পড়ে এই থানায়। কিন্তু এই বিশাল দায়িত্ব পালনের জন্য যে পরিমাণ জনবল প্রয়োজন, বাস্তবে তা নেই বললেই চলে।
থানা সূত্রে জানা গেছে, সদর কোতোয়ালি মডেল থানায় বর্তমানে ৪৪টি বিট রয়েছে। প্রতিটি বিটে নিয়মিত টহল, তথ্য সংগ্রহ ও জনসম্পৃক্ত পুলিশিং কার্যক্রম পরিচালনার কথা থাকলেও জনবল সংকটের কারণে অনেক বিট কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। সেখানে ৪৪ টি বিটে ৪৪জন থাকার কথা কিন্তু এস আই আছে ২২ জন যা মোট চাহিদার অর্ধেক,
তেমনি এএসআই রয়েছে ২১জন মোট চাহিদার অর্ধেক এই স্বল্পসংখ্যক কর্মকর্তার ওপরই পড়ছে মামলা রুজু, আসামি গ্রেপ্তার, তদন্ত তদারকি ও আদালতের কার্যক্রমের চাপ।
কনস্টেবল পদেও পরিস্থিতি ভালো নয়। কর্মরত আছেন মাত্র ২০ জন, যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম এই সীমিত সংখ্যক কনস্টেবল দিয়েই টহল, আসামি পাহারা, থানার নিরাপত্তা, আদালত ডিউটি ও বিশেষ অভিযান চালাতে হচ্ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সদর কোতোয়ালি মডেল থানায় বর্তমানে কোনো তদন্ত কর্মকর্তা (আইও) নেই। ফলে মামলার তদন্ত কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অনেক মামলার নথি পড়ে থাকছে, সাক্ষ্যগ্রহণ বিলম্বিত হচ্ছে, আর এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিচারপ্রক্রিয়ায়।
যেকোনো সময় বদলি হলে জনবল সংকট আরও তীব্র হবে।
এছাড়া থানায় নেই কোনো কার্যকর ইন্টেলিজেন্স ইউনিট। অপরাধপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করা, আগাম ঝুঁকি শনাক্ত করা কিংবা সংঘবদ্ধ অপরাধ প্রতিরোধে যে গোয়েন্দা তথ্য প্রয়োজন, তার বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
এই বাস্তবতায় প্রতিদিন থানায় আসা সাধারণ মানুষ সেবা পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করছেন। অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ গ্রহণ ও প্রাথমিক কার্যক্রম শেষ করতেই দেরি হচ্ছে। ভুক্তভোগীরা বলছেন, জনবল সংকটের দায় শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষকেই বহন করতে হচ্ছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, ময়মনসিংহ একটি বিভাগীয় শহর হওয়ায় এখানে শুধু সদর উপজেলার মানুষ নয়, আশপাশের উপজেলা ও জেলার মানুষও নানা প্রয়োজনে আসে। ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সদর কোতোয়ালি মডেল থানার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অথচ এই থানাই এখন জনবল সংকটে নাস্তানাবুদ।
এ অবস্থায় সামনে রয়েছে আরও বড় চ্যালেঞ্জ। আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রয়োজন হবে। পর্যাপ্ত পুলিশ সদস্য, গোয়েন্দা তৎপরতা ও দ্রুত প্রতিক্রিয়া ছাড়া নির্বাচনকালীন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, আগামীকাল ময়মনসিংহ সদরে আসছেন দেশের পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি)। তার এই সফরকে ঘিরে সদর কোতোয়ালি মডেল থানার বাস্তব জনবল সংকটের বিষয়টি সরাসরি তার দৃষ্টিতে আনার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় নাগরিক সমাজ, আইনজীবী ও সাংবাদিকরা।
তাদের বক্তব্য, দ্রুত অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য নিয়োগ ও পদায়ন না করা হলে এই থানার ওপর চাপ আরও বাড়বে। এতে একদিকে যেমন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঝুঁকিতে পড়বে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষ কাঙ্ক্ষিত পুলিশি সেবা থেকে আরও দূরে সরে যাবে।
বিভাগীয় শহরের কেন্দ্রীয় থানা হিসেবে সদর কোতোয়ালি মডেল থানাকে শক্তিশালী করা এখন সময়ের দাবি। জনবল বৃদ্ধি, তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ ও ইন্টেলিজেন্স ব্যবস্থা জোরদার না হলে চার লক্ষাধিক মানুষের নিরাপত্তা ও সেবার প্রশ্ন থেকেই যাবে।
এখন সবার চোখ আইজিপির আগমনের দিকে। এই সফর কি শুধু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি সদর কোতোয়ালি মডেল থানার জনবল সংকট নিরসনে কার্যকর সিদ্ধান্ত আসবে—সেই অপেক্ষায় ময়মনসিংহবাসী।




















